
সালমান হোসেন-জুড়ী প্রতিনিধিঃ
জনবল ও পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবার সংকটে স্থানীয়দের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে জুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এই সংকট দূর করে সেবা নিশ্চিতের নানা প্রতিশ্রুতি আর পদক্ষেপের ফিরিস্তি শোনা গেলেও কার্যত বাস্তবায়ন নেই। এমন অবস্থায় যথাযথ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে উপজেলার প্রায় দুই লাখ মানুষ।
কাগজে-কলমে ৫১ শয্যার এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মূলত শয্যা রয়েছে ৩১টি। বিশেষ পরিস্থিতিতে শয্যা সংকটের কারণে ভোগান্তি পোহাতে হয় রোগী ও তাদের স্বজনদের। বহুবার এই সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেও কর্তৃপক্ষের কোনো সাড়া মেলেনি।
২০০৪ সালের ২৪ আগস্ট জুড়ী উপজেলা গঠনের পর ৩১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা মামলায় দীর্ঘ ১০ বছর পর উপজেলার বাছিরপুর এলাকায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রায় ২২ কোটি টাকায় নির্মিত ভবনের হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা শুরু হয় ২০১৮ সাল থেকে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে সৃজনকৃত ৬৭ পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ৩৯টি পদ। এসব পদে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকার কারণে আনুষঙ্গিক সব ধরনের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয়রা। পর্যাপ্ত সেবা না পেয়ে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। উপজেলার প্রায় দুই লাখ মানুষের চিকিৎসার সর্বোচ্চ ভরসাস্থলটির প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন তারা। স্থানীয় কমিউনিটি ক্লিনিকে এমবিবিএস চিকিৎসক দিয়ে রোগীদের সেবা দেওয়ার কথা থাকলেও উপজেলা হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় সেখানকার চিকিৎসকরা হাসপাতালে বসে রোগী দেখেন। হাসপাতালটি ৫১ শয্যার হলেও নেই পর্যাপ্ত বেড। প্রতিদিন ভর্তি রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি পরিবেশও ভালো নেই। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ গোটা প্রাঙ্গণে। চিকিৎসকসহ হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের অনেকেই জানান, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মী না থাকায় এই অবস্থা। এমনকি ভর্তি রোগীদের বেড ও ওয়ার্ড পরিষ্কার করা হয় না ঠিকমতো।
এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আটজন এমবিবিএস চিকিৎসকের পাশাপাশি আরও সাতজন চিকিৎসকের সংকট রয়েছে। যারা আছেন তাদের অধিকাংশ ইউনিয়নভিত্তিক কমিউনিটি ক্লিনিকের দায়িত্বে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের মধ্যে একজন ছাড়া সবাই উচ্চশিক্ষার জন্য বদলির আবেদন করেছেন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেই পর্যাপ্ত সেবার ব্যবস্থা। মাত্র একজন স্যাকমো পুরো হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন একজন মাত্র সিনিয়র নার্স নিয়ে।
ভর্তি রোগীদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য পাঁচজন আয়া থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন মাত্র দুজন। রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য যে নার্সের প্রয়োজন সে পদেও রয়েছে অনেক সংকট। ২৫ জন নার্সের বিপরীতে রয়েছেন মাত্র ৯ জন।
হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, ইমার্জেন্সিতে চিকিৎসা নিতে মফস্বল এলাকা থেকে রোগীরা আসছেন। তাদের মধ্যে যাদের ভর্তি প্রয়োজন, তাদের ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে পর্যাপ্ত সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে রয়েছে নানা সংকট। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে জানা যায়, প্রতিদিন গড়ে ১৫০-২০০ জন এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। এ হিসাবে মাসে গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার মানুষের চিকিৎসার একমাত্র স্থান এ হাসপাতাল। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত হাসপাতালের আউটডোরে চিকিৎসা নেন উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রোগীরা।
রব মিয়া নামে এক রোগীর অভিভাবক জানান, তার বাচ্চার ডায়রিয়াজনিত সমস্যা। তাই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মোটামুটি সেবা পাচ্ছেন, তবে পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর। প্রচণ্ড দুর্গন্ধ।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সমরজিৎ সিংহ জানান, হাসপাতালে জনবল সংকট রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে সম্প্রতি চুক্তিভিত্তিক কয়েকজন আয়া ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জরুরি বিভাগে পর্যাপ্ত স্যাকমো না থাকায় কমিউনিটি ক্লিনিকের দায়িত্বে থাকা স্যাকমোদের দিয়ে সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
আপনার মতামত লিখুন :