মানবিককর্মীদের মাধ্যমে ভবঘুরে উজ্জ্বলের চিকিৎসা শুরু


alochitosnp07 প্রকাশের সময় : এপ্রিল ১০, ২০২৬, ৩:৫৮ অপরাহ্ন /
মানবিককর্মীদের মাধ্যমে ভবঘুরে উজ্জ্বলের চিকিৎসা শুরু

সুচিকিৎসা ও খাদ্যের অভাবে মানবেতর জীবন কাটানো ভবঘুরে উজ্জ্বলকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আপন ঠিকানায় ফিরেছে ভবঘুরে উজ্জ্বল রায় (৪০)। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) পূর্ণ্যাঙ্গ চিকিৎসার জন্য উজ্জ্বলকে পুনঃরায় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গত ৩১ মার্চ আলোচিত বিশ্বনাথ ডটকম-এ ‘বিশ্বনাথে ভবঘুরে উজ্জ্বলের মানবেতর জীবন, প্রয়োজন সুচিকিৎসার’ শিরোনামে সংবাদটি প্রকাশ হয়।

আর ওই সংবাদটি প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে টনক নড়ে প্রশাসন’সহ সর্বমহলের। সংবাদটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করার সূত্র ধরেই আপন ঠিকানায় ফিরেছে দীর্ঘ প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে ঠিকানাহীনভাবে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো সেই ‘পাগল’ বেশধারী উজ্জ্বল। তাকে কাঙ্খিত চিকিৎসা সেবা দিতে এগিয়ে এসেছেন কিছু মানবিককর্মী। এথেকে পিছিয়ে ছিল না ভবঘুরে উজ্জ্বলের সেই বাল্যবন্ধু চা-বিক্রেতা ঝুমন দাসও। যে কিনা প্রতিদিন ৪/৫ বার উজ্জ্বলের সাথে দেখা করে তার খোঁজ-খবর নিত, আর সমাজের বিভিন্ন জায়গায় উজ্জ্বলের চিকিৎসা পাওয়ার প্রয়োজনের কথাটি তুলে ধরতো।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ভবঘুরে উজ্জ্বলকে নিয়ে সংবাদটি প্রকাশের পর থেকেই সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী- পেশার লোকজন তার খোঁজ শুরু করেন। এসময় অনেকেই তাকে বিভিন্ন রকমের খাবার দিয়ে তার পাশে থাকার চেষ্ঠা শুরু করে প্রশাসন’সহ সমাজের বিত্তবানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিষয়টি মানুষের নজর খাড়ে। আর এরই সূত্র ধরে আলোচিত বিশ্বনাথ ডটকম-এ সংবাদ প্রকাশের ৩/৪ দিন পরই মানবিক কর্মী নাসির উদ্দিন নিজের টিমের কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবককে সাথে নিয়ে ভবঘুরে উজ্জ্বলের সহায়তায় এগিয়ে আসেন।

মানবিক নাসিরের টিমের সদস্যরা উজ্জ্বলকে খোঁজে বের করে চুল-দাঁড়ি কাটিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেন এবং নতুন কাপড় পরিয়ে উজ্জ্বলের বড় বোনকে সাথে নিয়ে চিকিৎসার জন্য প্রখমে সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা প্রদান করে উজ্জ্বলের উন্নত চিকিৎসার জন্য কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন। প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসা প্রদান শেষে সেই মানবিক টিমের সদস্যরা উজ্জ্বলকে তার পরিবারের সদস্যদের জিম্মায় তার বড় বোনের বাসায় রাখেন। আর বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) মানবিক কর্মী নাসিরের টিমের সদস্যরা পূর্ণ্যাঙ্গ চিকিৎসার জন্য উজ্জ্বলের পরিবারের সদস্যদের সাথে নিয়ে তাকে (উজ্জ্বল) সিলেট এএমজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন। এরপর থেকেই শুরু হয়েছে সেই ভবঘুরে উজ্জ্বলের সু-চিকিৎসা। এখন প্রয়োজন সরকার বা সমাজের বিত্তবানদের আর্থিক সহযোগীতা।

উজ্জ্বলের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে উজ্জ্বল ছিলেন বেশ চনমনে। আর দশটা শিশুর মতোই আনন্দে কেটে ছিল উজ্জ্বলের শৈশবটা। কিন্তু উজ্জ্বলের পিতার অকাল মৃত্যুতে পরিবারটি চরম দারিদ্র্যতার মুখে পড়ে। আর অভাবের সেই শোক সইতে না পেরে এক সময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে উজ্জ্বল। এরপর থেকে দীর্ঘ প্রায় ২৪ বছর (দুই যুগ) ধরে বিশ্বনাথের বাজার আর গলিপথই যেনো ছিল উজ্জ্বলের ঘরবাড়ি। খেয়ে, না খেয়ে কাটতে শুরু হয় তার দিনরাত। অযত্ন আর অবহেলায় পাগলের মতো আচরণ করায় কেউ তার কাছে ভিড়ত না। যেখানে রাত হতো, সেখানেই ঘুমিয়ে পড়তো উজ্জ্বল।

কান্নাভেজা কণ্ঠে উজ্জ্বলের বয়োবৃদ্ধ মা বলেন, বর্তমানে আমি নিজেও খুব অসহায়। চোখের মধ্যে সমস্যা থাকায় এখন আর প্রায় কিছুই দেখতে পারছি না। উজ্জ্বলকে অনেক বার বাসায় আটকে রাখার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সে দৌড়ে পালিয়ে যেত। এখনতো ওর দুই পায়ের অবস্থাই খুব খারাপ। আর আমার অন্য পুত্রটি থেকেও যেনো নেই, সে আমাদের কোনো খোঁজ-খবর রাখেনা। মেয়ের আশ্রয়েই এখন আছি আমি। তাই সরকার’সহ সমাজের সর্বমহলের কাছে আমার আকুল মিনতি আপনাদের সার্বিক সহযোগীতায় যেনো আমার ছেলেটি (উজ্জ্বল) সুচিকিৎসা পায়।

এদিকে উজ্জ্বলের চিকিৎসা যারা আর্থিকভাবে এবং মানসিকভাবে এগিয়ে এসেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে তার পরিবার সদস্যরা।